- খালাম্মা, কাইল রাইতে খালু আমারে....
- তুই যাবি এখান থেকে!!
অগ্নিদৃষ্টিতে
তাকালাম সালমার দিকে। সকাল থেকে এই নিয়ে চারবার শুনলাম কথাটা। ভেবেছে কি
ওর কথা বিশ্বাস করবো?? আমার সহজ সরল স্বামীটাকে ফাঁসাতে চাইছে। সোসাইটিতে
একটা বদনাম হওয়ার আগেই বেতন দিয়ে বিদায় করে দিলাম সালমাকে। বের করে দেয়ার
সময় ওর করুণ মুখটার দিকে তাকিয়ে খুব মায়াই লাগলো। তারপরও নিষ্ঠুরের মতো
মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলাম।
অনেক কষ্টে একটা কাজের মেয়ে
পেয়েছিলাম। বুঝিনা কেন আমার বাসায় কাজের বুয়া বেশিদিন টিকে না ?? অথচ
অন্যান্য ফ্ল্যাটের ভাবিদের থেকে আমি বেশি টাকা বেতন দেই।
দুইমাস
আগে হাসনা নামের একজন কাজের মেয়ে ছিল। খুব ভাল কাজ করতো মেয়েটা। কিছুদিনের
জন্য বেড়াতে গিয়েছিলাম, মামাতো ভাইয়ের বিয়েতে। আসিফ যেতে পারেনি,অফিসে অনেক
কাজ ছিল তো তাই। এসে দেখি মেয়েটা নেই। অাসিফ বললো, মেয়েটা নাকি মানিব্যাগ
থেকে টাকা চুরি করেছিলো তাই সে তাকে বাসা থেকে বের করে। তা বেশ করেছে। আমার
স্বামী অনেক নীতিবান, অন্যায় সে সহ্যই করে না। কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটের
ভাবিদের এসব সহ্য হয় না, তাইতো শুধু আমার স্বামীর নামে কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়।
বলে কিনা, যেদিন আমি বাসায় ছিলাম না সেই রাতে তারা আমাদের বাসায় চিৎকার
চেঁচামেচি শুনে দরজা খুলে দেখে এলোমেলো কাপড়ে হাসনা আমাদের ঘর থেকে দৌড়ে
বেরোচ্ছে আর আসিফকে শাসাচ্ছে, "খালাম্মারে সব কইয়া দিমু আপনে আমার লগে কি
করছেন... " আসিফ ওকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। মেয়েটা
তখন আসিফের নামে প্রতিবেশীদের কাছে যতসব আজেবাজে কথা বলতে থাকে। যদিও আমি
ওসব মোটেও বিশ্বাস করিনি, কারণ আমার স্বামী ফেরেশতার মতো।
সেদিন
ছেলেদেরকে স্কুল থেকে নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখি এক জায়গায় মহিলাদের জটলা।
মহুয়ার আম্মুকে দেখলাম মুখ থমথমে। উনার সাথে আমার অনেক দিনের ভাব। গিয়ে
জিগ্যেস করলাম, "কি হয়েছে ভাবি??" উনি আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন, লবণ
শেষ হয়ে গিয়েছিল তাই আমাদের বাসায় তার ৭ম শ্রেণীতে পড়ুয়া মহুয়াকে
পাঠিয়েছিলেন একবাটি লবণের জন্য। বাসায় তখন আসিফ ছাড়া আর কেউ ছিল না। তখন
নাকি আসিফ মহুয়াকে....
আমি রাগে ক্ষোভে চিৎকার করে উঠলাম, "থামেন!!
আর একটা কথা ও বলবেন না। আমাদের দুটি ছেলে কোন মেয়ে নাই এজন্য আসিফ মেয়ে
বাচ্চাদের অনেক আদর করে। মহুয়াকে ও নিজের মেয়ের মতোই আদর করে। আর আপনি
কিনা ওর নামে এমন নোংরা কথা বলছেন!!... "
সেই থেকে মহুয়ার আম্মুর সাথে আমার মুখ দেখাদেখি বন্ধ। আমার চরিত্রবান স্বামীর নামে এত বড় অপবাদ!!
আমার
ছোট বোন দিবা ভার্সিটি এডমিশনের জন্য ঢাকা এসেছে। আমার বাসায় থেকেই
পরীক্ষা দিবে। সেদিন কিচেনে রান্না করার সময় দিবা এসে ইতস্তত করতে থাকে।
- কিরে কিছু বলবি??
- আপু দুলাভাইর আচরণ কেমন যেন, আমার ভালো লাগে না। যখন তখন শুধু গায়ে হাত দেয়, জড়িয়ে ধরে...
আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম,
- আরে ধুর, তুই না কিসব ভাবিস!!! আসিফ তোকে ছোট বোনের মত ভাবে তাই একটু জড়িয়ে ধরে। তুই অত নেগেটিভ ভাবে নিস না তো!!
সেদিন
রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখি আসিফ পাশে নেই। বেডরুমের সাথেই এটাচড
বাথরুম, সেখানে ও নেই। এত রাতে ও কোথায় যাবে?? আসিফের নাম ধরে ডাকলাম। ও
হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকলো।
- কোথায় গিয়েছিলে??
- পা.. পানি খেতে....
- পানি খেতে মানে?? সাইড টেবিলেই তো জগ গ্লাস রাখা।
- খেয়াল করিনি
বলে ও কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে পড়লো।
কিচেনের লাইট অন নাকি দেখার জন্য রুম থেকে বেরিয়ে দেখি কিচেনের লাইট অফ কিন্তু দিবার রুমের লাইট অন। ও কি পড়ছে এখনও??
দিবার রুমে গিয়ে দেখলাম ও খাটে বসে আছে।
- কিরে এখন ও ঘুমাসনি??
বলে ওর কাঁধে হাত রাখলাম। থরথর করে কাঁপছে ও। কোন কথা বলছে না, আমার দিকে চেয়ে ও দেখলো না। লাইট অফ করে দিয়ে চলে এলাম আমি।
সারা
রাত ঘুমোতে পারিনি। আজকে দিবার অবস্থা দেখে সুমাইয়ার কথা মনে পড়ে গেল।
বছর দুয়েক আগের কথা। ৭/৮ বছরের সুমাইয়া নামের একটা কাজের মেয়ে ছিল। কিচেনের
ফ্লোরে ঘুমাতো ও। প্রতিরাতেই পানি খাওয়ার নাম করে আসিফ কিচেনে যেতো। ওর
কষ্ট হয় ভেবে বেডের পাশে সাইড টেবিলে জগ গ্লাস রেখে দিলাম। একদিন ঘুম ভেঙে
দেখি আসিফ পাশে নেই। কিচেনের লাইট জ্বলছে বলে দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি
সুমাইয়া গুটিসুটি মেরে বসে আছে, কাঁদছে। সামনে আসিফ দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে
চমকে গেল। আমি সুমাইয়ার মাথায় হাত রাখলাম,
- কি হয়েছে কাঁদছিস কেন??
ও থরথর করে কাঁপছিল দিবার মতো। কথা বলল না, শুধু অঝোরে কাঁদছে। আমি আসিফের দিকে তাকালাম।
- কি হয়েছে ওর??
- ফ্রিজ থেকে কেক চুরি করে খাচ্ছিল। দিয়েছি এক থাপ্পড়। ওকে সকালে বিদায় করে দিও। আমি যেন অফিস থেকে এসে ওকে না দেখি।
বলে আসিফ রুমে চলে গেল।
সকালে
উঠেই একজন লোক দিয়ে সুমাইয়াকে ওর গ্রামে পাঠিয়ে দিলাম। যদিও খুব মায়া
লাগছিল, কিন্তু আসিফ বলেছে। না পাঠালে ও মাইন্ড করবে। সবাই বলে আমি নাকি
স্বামী ভক্ত, অন্ধের মতো ওকে বিশ্বাস করি। যে যা বলুক, আমার কি!!
এতদিন আমার মনে কোন প্রশ্ন জাগেনি। কিন্তু আজকে মাথায় হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সারা রাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি।
সকালে
ছেলেদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম আসিফ, দিবা যার যার রুমে বেঘোরে
ঘুমোচ্ছে। তাই আর কাউকে ডিস্টার্ব করলাম না। বাইরে থেকেই মেইন ডোর লক করে
দিলাম।
সাধারণত আমি চার ঘন্টা পর স্কুল ছুটি হলে একবারেই ছেলেদের
নিয়ে বাসায় ফিরি। কিন্তু আজকে আসার সময় বাচ্চাদের বেতন বই ভুলে নিয়ে
আসিনি। তাই বাচ্চাদেরকে স্কুলে দিয়েই চলে এলাম বাসায়। চাবি ঘুরিয়ে দরজা
খুলে যেই ভেতরে ঢুকবো অমনি দিবার চিৎকার শুনতে পেলাম। জুতো সহ দৌড়ে গেলাম
দিবার রুমে। ঢুকে যা দেখলাম, তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না আমি। আমার
মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো।
আসিফ আমাকে দেখে আঁতকে উঠলো। ততক্ষণে
আমার রক্ত মাথায় চড়ে গেছে। পায়ের স্যান্ডেলটা খুলে ওকে এলোপাতাড়ি পেটাতে
লাগলাম। যতক্ষণ না স্যান্ডেলটা ছিঁড়লো ততক্ষণ পর্যন্ত ওকে পেটাতে থাকলাম।
চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আশেপাশের সব মানুষ ছুটে এলো। মহুয়ার আম্মু এসে আমার
হাত থেকে ছেঁড়া স্যান্ডেলটা ফেলে দিলেন,
- ভাবি, শান্ত হয়ে বসেন। কি হয়েছে আমাদেরকে বলেন।
আমি মহুয়ার আম্মুর গায়ে ঢলে পড়লাম,
-
ভাবি, আমি আপনার প্রতি অন্যায় করেছি, আমাকে মাফ করে দিয়েন। এই জানোয়ারটাকে
অন্ধ বিশ্বাস করে কত বড় পাপই না আমি করেছি!! ওরে আমি ছাড়বো না...
বলে
ছেঁড়া স্যান্ডেলটা তুলে নিয়ে আবার ওর নাকে মুখে পেটাতে লাগলাম। থানায় ফোন
করে পুলিশ আনলাম। ওর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা করলাম। যতজনকে ও
নির্যাতন করেছে সবার পক্ষ হয়ে আমি লড়বো।
দিবাকে মেডিকেল রিপোর্টের
জন্য হসপিটালে আনা হয়েছে। সাথে মহুয়ার বাবা মা ও আছেন। উনারা না থাকলে
আমি এতকিছু করতে পারতাম না। তাঁদের মুখের দিকে তাকাতেও আমার লজ্জা করছে।
পেছন থেকে কেউ একজন সালাম দিলো। ঘুরে তাকিয়ে দেখি সালমা। ও এই হসপিটালে আয়ার কাজ করে। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম,
- আমাকে মাফ করে দিস, আমি তোর প্রতি অনেক অন্যায় করেছি।
- আমি কিছু মনে রাখি নাই গো খালাম্মা...
বলে ও অঝোরে কাঁদতে লাগলো।
সালমাকে
রাজি করালাম আসিফের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে। হাসনাকে ও খুঁজে বের করবো।
সুমাইয়ার বাড়িতে ও যাবো। আমি ওদের সবাইকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিবো। যত যাই
হোক, আমি ওদের পক্ষে লড়বো।
আল্লাহর কাছে শুধু অভিযোগ করতাম, কেন
আল্লাহ আমাকে একটা মেয়ে সন্তান দিলো না। কিন্তু আজকে আমি আল্লাহর দরবারে
কোটি কোটি শুকরিয়া জানাই যে তিনি আমাকে কোন মেয়ে সন্তান দেননি। কারণ এসব
মানুষরূপী পিশাচদের কাছে অন্যের মেয়ে কেন নিজের মেয়ে ও নিরাপদ নয়!!
( সমাপ্ত )
লেখা : আফরিন শোভা